blogs img

Blogs

09/02/2026

জনপ্রতিনিধি হিসেবে জনগণের কাছে জবাবদিহিতা কেন জরুরি

রাজনীতি কেবল একটি ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়; বরং এটি একটি আদর্শিক সংগ্রাম এবং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত একটি পবিত্র 'আমানত'। আপনারা ১৯৯১ এবং ২০০১ সালে দুইবার ভালোবেসে আমাকে আপনাদের প্রতিনিধি হিসেবে জাতীয় সংসদে পাঠিয়েছিলেন। সেই দীর্ঘ সময় থেকে আজ অবধি আমি আমার জীবনের একটি মূলনীতি স্থির করেছি আর তা হলো 'জবাবদিহিতা'। জনপ্রতিনিধি হওয়া মানে জনগণের ওপর কর্তৃত্ব করা নয়, বরং নিজেকে জনগণের খাদেম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।

২০২৬ সালের নির্বাচনে আমি যখন আবারও আপনাদের সামনে দাঁড়িয়েছি, তখন আমার মনে হয়েছে একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার জন্য 'জবাবদিহিতা' কেন অপরিহার্য, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন।

১. আমানত রক্ষা ও নৈতিক দায়বদ্ধতা

একজন জনপ্রতিনিধি যখন নির্বাচিত হন, তখন তিনি মূলত জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং রাষ্ট্রের সম্পদের পাহারাদার হন। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এই দায়িত্বটি একটি বড় পরীক্ষা। পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে আমানত রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, জনগণের প্রতিটি ভোট আমার কাছে একটি আমানত, আর সরকারের পক্ষ থেকে আসা প্রতিটি উন্নয়নমূলক বরাদ্দ জনগণের হক।

জবাবদিহিতা যেখানে নেই, সেখানে এই আমানতের খিয়ানত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। একজন জনপ্রতিনিধি যদি মনে করেন যে তাকে কারো কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে না, তবে তিনি পথভ্রষ্ট হতে পারেন। কিন্তু যখন তিনি জানেন যে তাকে একদিন এই সাধারণ মানুষের মুখোমুখি হতে হবে এবং সর্বোপরি হাশরের ময়দানে আল্লাহর কাছে হিসাব দিতে হবে, তখন তিনি দুর্নীতির ধারেকাছেও যাবেন না। তাই জবাবদিহিতা হলো একজন নেতার নৈতিক রক্ষাকবচ।

২. দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ

শ্যামনগরের মতো উন্নয়নকামী এলাকায় সরকারের প্রচুর বরাদ্দ আসে। কিন্তু আমরা প্রায়ই দেখি সঠিক জবাবদিহিতার অভাবে অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ মাঝপথে থমকে যায় অথবা নিম্নমানের কাজ হয়।

  • স্বচ্ছতার অভাব: কেন একটি রাস্তার কাজ শেষ হতে বছরের পর বছর লাগে? কেন গরীবের হকের টিআর-কাবিখা সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছায় না? এর কারণ হলো তথ্যের অভাব ও জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি।

  • আমার অঙ্গীকার: জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলে টেন্ডারবাজি, সিন্ডিকেট আর স্বজনপ্রীতি বন্ধ হতে বাধ্য। একজন জনপ্রতিনিধি যখন প্রতিটি পাইপয়সার হিসাব জনসম্মুখে প্রকাশ করবেন, তখন অসাধু চক্র আর সুযোগ পাবে না। স্বচ্ছতা কেবল কাগজে-কলমে থাকলে চলে না, তা জনগণের চোখে দৃশ্যমান হতে হয়।

৩. জনপ্রতিনিধি ও জনগণের মধ্যকার দূরত্ব ঘোচানো

আমাদের প্রচলিত রাজনীতিতে একটি বড় অভিযোগ হলো নেতারা শুধু ভোটের সময় জনগণের দুয়ারে আসেন, আর নির্বাচিত হওয়ার পর তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যান। এই সংস্কৃতি রাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের অশ্রদ্ধা তৈরি করে। জবাবদিহিমূলক রাজনীতি এই দূরত্ব কমিয়ে দেয়। একজন আদর্শ নেতা নিয়মিত তার এলাকার মানুষের সাথে বসবেন, তাদের অভাব,অভিযোগ শুনবেন এবং নিজের সীমাবদ্ধতার কথা অকপটে স্বীকার করবেন। আমি যখন সংসদ সদস্য ছিলাম, সবসময় চেষ্টা করেছি সাধারণ মানুষের সাথি হয়ে থাকতে। কারণ জনগণের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে একজন নেতা তার এলাকার প্রকৃত সমস্যাগুলো আর বুঝতে পারেন না।

৪. সঠিক পরিকল্পনা ও সুষম উন্নয়ন

শ্যামনগর ভৌগোলিকভাবে বৈচিত্র্যময়। গাবুরা বা পদ্মপুকুরের সমস্যা আর শ্যামনগর সদরের সমস্যা এক নয়। জবাবদিহিতা থাকলে একজন নেতা প্রকল্প গ্রহণের আগে স্থানীয় মানুষের সাথে পরামর্শ করতে বাধ্য হন। জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্থায় 'নিচ থেকে ওপরে' উন্নয়ন পরিকল্পনা যায়। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষ বলবে তাদের কী প্রয়োজন, আর নেতা সেই অনুযায়ী বরাদ্দ আনবেন। যখন জনগণের কাছে জবাব দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে, তখন অপ্রয়োজনীয় জৌলুসপূর্ণ প্রকল্পের চেয়ে মানুষের জীবন বাঁচানোর প্রকল্পগুলো (যেমন: টেকসই বাঁধ নির্মাণ বা সুপেয় পানির ব্যবস্থা) বেশি গুরুত্ব পায়।

৫. শুদ্ধ রাজনীতির চর্চা ও আগামী প্রজন্মের প্রেরণা

আমরা যদি আজ জবাবদিহিতার উদাহরণ তৈরি করতে না পারি, তবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের তরুণরা রাজনীতিতে আসতে ভয় পাবে বা রাজনীতিকে ঘৃণা করবে। একজন নেতার সততা ও দায়িত্বশীলতা দেখে হাজার হাজার তরুণ দেশপ্রেমের দীক্ষা নেয়। রাজনীতির এই শুদ্ধিকরণ কেবল তখনই সম্ভব যখন একজন প্রতিনিধি নিজেকে জনগণের ঊর্ধ্বে মনে না করে জনগণের একজন হিসেবে বিবেচনা করবেন।


যেভাবে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করব

২০২৬ সালের নির্বাচনে যদি আপনারা আমাকে পুনরায় আপনাদের সেবা করার সুযোগ দেন, তবে আমি শ্যামনগরকে জবাবদিহিতার একটি রোল মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। আমার সুনির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা হলো:

১. মাসিক গণশুনানি: আমি ঘোষণা দিচ্ছি যে, প্রতি মাসে অন্তত একদিন প্রতিটি ইউনিয়নে উন্মুক্ত 'গণশুনানি'র আয়োজন করা হবে। সেখানে আমি নিজে উপস্থিত থেকে জনগণের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেব। আপনাদের অভিযোগ বা প্রস্তাবগুলো সরাসরি গ্রহণের জন্য এটি হবে একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম।

 ২. ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার ও ড্যাশবোর্ড: শ্যামনগরের জন্য সরকারি ও বেসরকারি যে কোনো বরাদ্দ আসার সাথে সাথে তা আমার অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হবে। কোন প্রকল্পের কাজ কে করছে, কত টাকা বাজেট এবং কত দিনের মধ্যে শেষ হবে সব তথ্য আপনাদের হাতের মুঠোয় থাকবে। এতে দুর্নীতির কোনো সুযোগ থাকবে না।

 ৩. ওয়ার্ডভিত্তিক তদারকি কমিটি: প্রতিটি ওয়ার্ডে দলমত নির্বিশেষে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সচেতন যুবকদের নিয়ে 'উন্নয়ন তদারকি কমিটি' গঠন করা হবে। তারা কাজের মান যাচাই করবে এবং কোনো অনিয়ম দেখলে সরাসরি আমাকে জানানোর ক্ষমতা রাখবে।

৪. সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা: সাধারণ মানুষের জন্য একটি সার্বক্ষণিক 'হটলাইন' চালু থাকবে। সরাসরি আমার দপ্তরে আপনার সমস্যা বা দুর্নীতির খবর পৌঁছানোর জন্য কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর প্রয়োজন হবে না।


জনগণই হলো একটি রাষ্ট্রের প্রাণ। আর জনপ্রতিনিধি হলো সেই প্রাণের সেবক। আমি গাজী নজরুল ইসলাম, সারাজীবন আপনাদের হকের কথা বলেছি, আপনাদের পাশে থেকেছি। আমি মনে করি, একজন নেতার সবচেয়ে বড় সার্টিফিকেট হলো জনগণের ভালোবাসা ও বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাস অর্জনের একমাত্র চাবিকাঠি হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।

আমরা যদি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারি, তবেই শ্যামনগর হবে দুর্নীতিমুক্ত, নিরাপদ এবং ইনসাফভিত্তিক একটি জনপদ। আমি আপনাদের কাছে কোনো শাসন করার ক্ষমতা চাই না, বরং আপনাদের সেবক হিসেবে কাজ করার সুযোগ চাই। আসুন, আমরা এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলি যেখানে নেতা হবে জনগণের পাহারাদার, মালিক নয়।

আল্লাহ আমাদের সকলকে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার তৌফিক দান করুন।

"আল্লাহর আইন চাই, সৎ লোকের শাসন চাই"


গাজী নজরুল ইসলাম

সাবেক সংসদ সদস্য, সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) 

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী