blogs img

Blogs

09/02/2026

কর্মসংস্থান ও তরুণ সমাজ: সুন্দরবন কেন্দ্রিক নতুন অর্থনৈতিক দিগন্ত

আসসালামু আলাইকুম।

 শ্যামনগর উপজেলা কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, এটি এক অমিত সম্ভাবনার নাম। আমাদের একদিকে যেমন উত্তাল সমুদ্র আর প্রতিকূল প্রকৃতি, অন্যদিকে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আমি শ্যামনগরের প্রতিটি ইউনিয়ন, প্রতিটি গ্রাম চষে বেড়িয়েছি। আমি দেখেছি এখানকার তরুণদের চোখের স্বপ্ন, কিন্তু একইসাথে দেখেছি কর্মসংস্থানের অভাবে তাদের সেই স্বপ্নের অপমৃত্যু।

২০২৬ সালের এই জাতীয় নির্বাচন আমাদের সামনে এক নতুন সুযোগ নিয়ে এসেছে। আমি বিশ্বাস করি, শ্যামনগরের বেকারত্ব দূর করতে আমাদের বাইরের কোনো কৃত্রিম সাহায্যের প্রয়োজন নেই। আমাদের হাতের কাছেই রয়েছে সুন্দরবনের অবারিত সম্পদ। এই সম্পদকে যদি আমরা আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে কাজে লাগাতে পারি, তবে শ্যামনগর হবে দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক হাবে। আজ আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরব কীভাবে সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে আমরা আমাদের তরুণদের জন্য এক নতুন অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে পারি।

১.  হানি প্রসেসিং সেন্টার তৈরির মাধ্যমে মধু শিল্পে আধুনিকায়ন

সুন্দরবনের মধু বিশ্বের সেরা প্রাকৃতিক মধুগুলোর একটি। আমাদের মওয়ালরা প্রতি বছর প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে গহীন বন থেকে মধু সংগ্রহ করে আনেন। কিন্তু আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা ও শোধন প্রক্রিয়ার অভাবে এই অমূল্য সম্পদ তার সঠিক মর্যাদা পাচ্ছে না।

আমার কর্মপরিকল্পনা: আমি যদি আপনাদের সমর্থনে আবারও সংসদে যাওয়ার সুযোগ পাই, তবে শ্যামনগরে একটি আধুনিক 'মধু প্রসেসিং ও মান নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র' স্থাপন করা হবে।

  • এর ফলে মওয়ালরা আর দালালের খপ্পরে পড়বে না। তারা সরাসরি সরকারি ও বেসরকারি এই সেন্টারে মধু জমা দিয়ে ন্যায্য মূল্য পাবে।

  • স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মধুর আধুনিক প্যাকেজিং এবং ব্র্যান্ডিংয়ে যুক্ত করা হবে।

  • আমাদের লক্ষ্য হবে 'শ্যামনগরের মধু'কে একটি আন্তর্জাতিক মানের ব্র্যান্ড হিসেবে দাঁড় করানো, যেন আমাদের শিক্ষিত তরুণরা ই-কমার্সের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে এটি রপ্তানি করতে পারে।

২. অবাধ ব্যবসা করার জন্য সিন্ডিকেট ও হয়রানির অবসান

বর্তমানে আমাদের জেলে, মওয়াল এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা নানা ধরনের প্রশাসনিক ও অসাধু সিন্ডিকেটের জালে বন্দি। সুন্দরবনে প্রবেশ থেকে শুরু করে পণ্য বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে তারা বাধার সম্মুখীন হন। এই অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক তরুণ এই পৈতৃক পেশা ছেড়ে শহরে গিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে।

আমার অঙ্গীকার: ব্যবসায়িক পরিবেশকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ও অবাধ করা হবে।

  • সুন্দরবনের সম্পদ আহরণে মওয়াল ও জেলেদের ওপর থেকে সকল প্রকার কৃত্রিম ও হয়রানিমূলক বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হবে।

  • কোনো প্রকার অদৃশ্য চাঁদা বা সিন্ডিকেট ছাড়াই যেন একজন সাধারণ মওয়াল তার পণ্য সরাসরি পাইকারের কাছে বিক্রি করতে পারে, সেই নিশ্চয়তা আমি দেব।

  • যারা নতুনভাবে সুন্দরবন কেন্দ্রিক ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে তুলতে চায়, সেসব তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ট্রেড লাইসেন্স ও অন্যান্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করা হবে।

৩. আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে মাছ ও কাঁকড়া শিল্পের আধুনিকায়ন

আমাদের এই অঞ্চলের কর্মসংস্থান মূলত নদী ও বন নির্ভর। আমাদের জেলেরা আজও পুরনো পদ্ধতিতে মাছ ও কাঁকড়া ধরেন। সঠিক সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় তারা অধিকাংশ সময় লোকসানের মুখে পড়েন।

  • আধুনিক হিমাগার স্থাপন: শ্যামনগরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটে এবং বাণিজ্যিক এলাকায় আধুনিক হিমাগার স্থাপন করা হবে। এতে জেলেরা তাদের আহরিত মাছ ও কাঁকড়া পচে যাওয়ার ভয়ে সস্তায় বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না।

  • রপ্তানি মুখী কাঁকড়া চাষ: নোনা পানিতে কাঁকড়া ও কুঁচে চাষের যে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, তাকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে তরুণদের কাছে জনপ্রিয় করা হবে। তরুণরা এই খাতে বিনিয়োগ করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ খুঁজে পাবে।

৪. ইকো-ট্যুরিজম ও পর্যটন খাত

সুন্দরবন দেখতে প্রতি বছর হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক আসেন। কিন্তু পর্যটনের এই বিপুল অর্থ স্থানীয়দের পকেটে না গিয়ে বড় বড় কোম্পানির কাছে চলে যায়।

  • স্থানীয়দের সম্পৃক্ততা: আমি এমন একটি নীতিমালা প্রণয়ন করতে চাই যেখানে সুন্দরবন কেন্দ্রিক পর্যটনে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

  • ট্যুরিস্ট গাইড ও আতিথেয়তা: আমাদের যুবকদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ ট্যুরিস্ট গাইড হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

  • কুটির শিল্প ও স্যুভেনিয়ার শপ: সুন্দরবনের ঐতিহ্যবাহী পণ্যগুলো পর্যটকদের কাছে পৌঁছে দিতে তরুণরা ছোট ছোট দোকান ও বিপণন কেন্দ্র গড়ে তুলবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে।


তারুণ্যের কর্মসংস্থানে আমার সুনির্দিষ্ট ভাবনা 

আমি বিশ্বাস করি, অলস হাত শয়তানের কারখানা। আমাদের তরুণদের হাতে যদি কাজ থাকে, তবে সমাজ থেকে মাদক ও অন্যায় এমনিতেই দূর হবে। আমার আগামীর পরিকল্পনায় রয়েছে:

১. উদ্যোক্তা ঋণ কর্মসূচি: মধু প্রসেসিং, মাছের ঘের বা পর্যটন খাতে যারা ছোট ব্যবসা শুরু করতে চায়, সেসব তরুণদের জন্য জামানতবিহীন ও সহজ শর্তে সরকারি ঋণের ব্যবস্থা করা। 

২. নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ: সুন্দরবনের মওয়াল, বাওয়ালি ও জেলেরা যেন কোনো দস্যুতা বা বনের অসাধু কর্মকর্তাদের হয়রানি ছাড়াই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, সেজন্য সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও মনিটরিং নিশ্চিত করা। 

৩. কারিগরি প্রশিক্ষণ ও আইটি সেন্টার: প্রতিটি ইউনিয়নে আইটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। সুন্দরবনের সম্পদের খবর প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে তরুণদের দক্ষ করা হবে।


আমার প্রিয় শ্যামনগরের তরুণ সমাজ, তোমরা আমাদের আগামীর কাণ্ডারি। তোমাদের পূর্বপুরুষরা সুন্দরবনের প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে টিকে থাকার ইতিহাস গড়েছেন। আজ আমাদের লড়াই দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে। আমি গাজী নজরুল ইসলাম, সারাজীবন আপনাদের হকের কথা বলেছি। আপনাদের মেধা আর সুন্দরবনের সম্পদ এই দুয়ের সমন্বয় ঘটিয়ে আমি এক নতুন ও সমৃদ্ধ শ্যামনগর গড়তে চাই।

আসুন, আমরা আমাদের আঞ্চলিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাই। আমরা এমন এক অর্থনীতি গড়ব যেখানে কোনো তরুণ নিজেকে অবহেলিত মনে করবে না। সুন্দরবন হবে আমাদের গর্বের প্রতীক, আর আপনারা হবেন সেই সমৃদ্ধির কারিগর।

"আল্লাহর আইন চাই, সৎ লোকের শাসন চাই"


গাজী নজরুল ইসলাম

সাবেক সংসদ সদস্য, সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর)

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী