blogs img

Blogs

08/02/2026

উপকূলীয় অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার সংকট ও সমাধানের পথ

সুন্দরবনের কোলঘেঁষা আমাদের এই শ্যামনগর। প্রকৃতির অবারিত দান আর মানুষের নিরন্তর সংগ্রামের এক অমর উপাখ্যান এই জনপদ। এ মাটির সন্তান হিসেবে আমি জানি, এখানকার বাতাস যেমন আমাদের ধৈর্য শেখায়, তেমনি এখানকার নোনা জল আমাদের জীবনের প্রতিটি বাঁকে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আসে। ১৯৯১ এবং ২০০১ সালে আপনারা আমাকে আপনাদের প্রতিনিধি হিসেবে জাতীয় সংসদে পাঠিয়েছেন। সেই সময় থেকে আজ অবধি, শ্যামনগরের প্রতিটি ধূলিকণা আর প্রতিটি মানুষের সুখ-দুঃখের সাথে আমি আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ।

২০২৬ সালের নির্বাচন আমাদের দোরগোড়ায়। তবে নির্বাচনের চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের অস্তিত্ব। বিশেষ করে শ্যামনগরের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা আজ যে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে নিরব থাকার সময় আর নেই। আজ আমি আপনাদের সাথে আলোচনা করতে চাই আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলের স্বাস্থ্য সংকটের গভীরতা এবং তা সমাধানের আমার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে।

লবণাক্ততা ও বর্তমান স্বাস্থ্যঝুঁকি

শ্যামনগরের স্বাস্থ্য সমস্যার প্রধান উৎস হলো জলবায়ু পরিবর্তন এবং ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা। এটি কোনো কাল্পনিক সমস্যা নয়, বরং আমাদের প্রতিটি ঘরে ঘরে এর প্রভাব দৃশ্যমান। গবেষণায় দেখা গেছে, উপকূলীয় এলাকার মহিলারা যারা প্রতিদিন লবণাক্ত পানি ব্যবহার করেন, তাদের মধ্যে জরায়ুর সমস্যা এবং গর্ভকালীন জটিলতার হার অনেক বেশি। গর্ভবতী মায়েদের উচ্চ রক্তচাপ বা ‘একলাম্পসিয়া’ হওয়ার ঝুঁকি এখানে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি।

লোনা পানির প্রভাবে কিডনি ও পিত্তথলিতে পাথর এবং দীর্ঘমেয়াদী কিডনি রোগের বিস্তার ঘটছে। অথচ এই বিশাল জনসংখ্যার চিকিৎসার জন্য আধুনিক কোনো ব্যবস্থা আমাদের হাতের নাগালে নেই। সাধারণ একটি পরীক্ষার জন্য বা মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচাতে আমাদের আজও সাতক্ষীরা সদর বা খুলনার দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকতে হয়।


সংকট সমাধানে আমার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও অঙ্গীকার

আমি বিশ্বাস করি, স্বাস্থ্যসেবা কোনো দয়া নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। ২০২৬ সালের নির্বাচনে আপনারা যদি আবারও আমাকে আপনাদের সেবা করার সুযোগ দেন, তবে শ্যামনগরকে একটি 'মডেল স্বাস্থ্য অঞ্চল' হিসেবে গড়ে তুলতে আমি নিচের ৪টি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে কাজ করব:

১. দ্বীপ ও দুর্গম অঞ্চলের জন্য ইউনিয়ন ভিত্তিক শক্তিশালী স্বাস্থ্য কাঠামো

শ্যামনগরের গাবুরা, পদ্মপুকুর বা কৈখালীর মতো ইউনিয়নগুলো মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। সেখানে বর্তমানে যে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো আছে, সেগুলো নামমাত্র সেবা দিচ্ছে।

  • কমিউনিটি ক্লিনিক উন্নয়ন: প্রতিটি ইউনিয়নের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে আমি আধুনিকায়ন করব। সেখানে শুধু প্রাথমিক চিকিৎসা নয়, বরং জরুরি প্রাথমিক চেকআপ এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।

  • লঞ্চ অ্যাম্বুলেন্স (Water Ambulance) চালু: দ্বীপ অঞ্চলের মানুষের জন্য আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো 'লঞ্চ অ্যাম্বুলেন্স'। নদীবেষ্টিত এই এলাকায় সড়ক পথের অ্যাম্বুলেন্স কোনো কাজে আসে না। তাই মুমূর্ষু রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোর জন্য সার্বক্ষণিক অক্সিজেন ও প্রাথমিক চিকিৎসাসম্পন্ন গতিসম্পন্ন লঞ্চ অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের ব্যবস্থা করা হবে।

২. উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা

আমাদের উপজেলা হাসপাতাল এখন রেফারেল সেন্টারে পরিণত হয়েছে। কোনো রোগী গেলেই তাকে বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আমি এই পরিস্থিতির পরিবর্তন আনব।

  • সার্বক্ষণিক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার: আমি নিশ্চিত করব যেন উপজেলা হাসপাতালে হার্ট (হৃদরোগ), চোখ এবং কিডনি রোগের বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা নিয়মিত রোগী দেখেন।

  • অ্যানেস্থেশিয়া ও অপারেশন থিয়েটার সচল করা: শ্যামনগরে অপারেশনের ব্যবস্থা থাকলেও অনেক সময় অ্যানেস্থেশিয়া ডাক্তারের অভাবে তা বন্ধ থাকে। আমি ক্ষমতায় গেলে নিশ্চিত করব যে, অপারেশনের সময় সার্বক্ষণিক অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ উপস্থিত থাকবেন, যেন সাধারণ অ্যাপেন্ডিসাইটিস বা সিজারের জন্য আমাদের মানুষকে শহরে দৌড়াতে না হয়।

  • ডায়ালাইসিস ইউনিট স্থাপন: কিডনি রোগীদের জন্য শ্যামনগরেই ডায়ালাইসিস করার সুবিধা চালু করার জন্য আমি সংসদে বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করব।

৩. প্রসূতি মা ও শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষা

একজন মা যখন সন্তান জন্ম দেন, তখন সেটি কেবল একটি পরিবারের আনন্দ নয়, সেটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। কিন্তু শ্যামনগরে সঠিক চিকিৎসার অভাবে মাতৃমৃত্যুর হার উদ্বেগজনক।

  • নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিতকরণ: প্রতিটি গর্ভবতী মায়ের জন্য বিনামূল্যে প্রসবকালীন চেকআপ এবং জরুরি সিজারিয়ান অপারেশনের ব্যবস্থা উপজেলা হাসপাতালেই নিশ্চিত করা হবে।

  • প্রসূতি সহায়তা কেন্দ্র: দুর্গম এলাকাগুলোতে ছোট পরিসরে মাতৃত্বকালীন সেবা কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে যেন প্রসব বেদনা ওঠার পর নদী পার হওয়ার আগেই তারা সঠিক চিকিৎসা পান।

৪. বিশুদ্ধ পানির মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ

স্বাস্থ্য সমস্যার মূল কারণ যেহেতু দূষিত ও লবণাক্ত পানি, তাই প্রতিটি ওয়ার্ডে সরকারি ও বেসরকারি অর্থায়নে বড় আকারের পানির ফিল্টার প্ল্যান্ট স্থাপন করা হবে। আমরা যদি বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করতে পারি, তবে আমাদের অঞ্চলের কিডনি ও পেটের রোগের প্রকোপ অনেকটাই কমে যাবে।


আমার কাছে রাজনীতি হল ইবাদত

প্রিয় শ্যামনগরবাসী, আমি আপনাদেরই সন্তান। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আমি দেখেছি কীভাবে একজন দরিদ্র বাবা তার সন্তানের চিকিৎসার জন্য শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে দেন। আমি দেখেছি গাবুরার কোনো মা সঠিক সময়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে না পেরে মাঝপথেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই দৃশ্যগুলো আমাকে নিদারুণভাবে পীড়া দেয়।

রাজনীতি আমার কাছে নিছক ক্ষমতা বা পদের নাম নয়। এটি একটি আমানত, এটি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য মানুষের সেবা করার মাধ্যম। অতীতে আপনারা আমাকে সংসদ সদস্য হিসেবে সুযোগ দিয়েছেন, আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। এবারও যদি আপনারা আমাকে আপনাদের সেবা করার সুযোগ দেন, তবে শ্যামনগর হবে একটি সুস্থ, সুন্দর এবং নিরাপদ জনপদ।

আমরা উপকূলের মানুষ, আমরা ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সাথে লড়াই করে টিকে থাকতে জানি। এবার আমরা লড়াই করব আমাদের বাঁচার অধিকার আমাদের স্বাস্থ্যসেবার অধিকার আদায়ের জন্য। আপনাদের দোয়া আর সমর্থন থাকলে ইনশাআল্লাহ আমরা এক নতুন শ্যামনগর গড়ব।

আসুন, আগামী নির্বাচনে আমরা উন্নয়নের পক্ষে, সেবার পক্ষে এবং ন্যায়ের পক্ষে রায় দিই। আপনাদের একটি ভোট হতে পারে নিরাপদ ও সুস্থ শ্যামনগর গড়ার চাবিকাঠি।


আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

গাজী নজরুল ইসলাম 

সাবেক সংসদ সদস্য, সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) 

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী