গাজী নজরুলের নির্বাচনী ইশতেহার

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম,

আসসালামু আলাইকুম, প্রিয় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সর্বস্তরের জনসাধারণ, মা-বোন এবং আমার কলিজার টুকরো তরুণ সমাজ।

আমি আপনাদেরই সন্তান, আপনাদেরই ভাই। ১৯৭১ সালে এই মাটির টানেই হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলাম একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। আজ জীবনের এই প্রান্তে এসে আবারও আপনাদের সামনে দাঁড়িয়েছি এক বুক স্বপ্ন নিয়ে। আমি দেখেছি আইলা-আম্পানের নোনা জলে আমাদের কৃষকের কান্না, দেখেছি ভাঙা বেড়িবাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে মানুষের অসহায়ত্ব। আমি জানি লোনা জলের এই জনপদে এক ফোঁটা সুপেয় পানি কত মূল্যবান।

 

আমি যখন আপনাদের এমপি ছিলাম, আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি আপনাদের পাশে থাকতে। আজ আবারও এমন এক সময়ে আমরা মিলিত হয়েছি যখন আমাদের এলাকাকে চাঁদাবাজি, মাদক আর অনিয়ম থেকে মুক্ত করার সময় এসেছে। আমি কোনো ক্ষমতার মোহে নয়, বরং সুন্দরবনের এই জনপদকে একটি নিরাপদ, বৈষম্যহীন এবং সমৃদ্ধ 'মডেল শ্যামনগর' হিসেবে গড়ে তোলার শেষ ইচ্ছা নিয়ে আপনাদের দোয়া ও সমর্থন চাইছি।

 

নিচে আমার আগামীর কর্মপরিকল্পনা বা ইশতেহার আপনাদের সম্মুখে পেশ করছি:

 

১. টেকসই উপকূল ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ (সুরক্ষিত জনপদ)

উপকূলীয় মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য আমরা 'নদী ভাঙ্গনমুক্ত শ্যামনগর' গড়ব।

  •  - স্থায়ী বেড়িবাঁধ: শ্যামনগর নদী ভাঙ্গনপ্রবণ এলাকায় ব্লক ও আধুনিক প্রযুক্তিতে স্থায়ী ও শক্তিশালী ওয়াবদা বাঁধ নির্মাণ করা হবে।

  • - জলাবদ্ধতা নিরসন: বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনের জন্য বৈজ্ঞানিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও স্লুইস গেট সংস্কার করা হবে।

  • - লবণাক্ততা ও সুপেয় পানি: উপকূলীয় জনগণের প্রধান সমস্যা সুপেয় পানির সমাধানকল্পে প্রতিটি ইউনিয়নে বৃহৎ পরিসরে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের আধুনিক প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে।


২. সুন্দরবন অর্থনীতি, পর্যটন ও বনজীবীদের সুরক্ষা

সুন্দরবনের সম্পদ রক্ষা এবং একে কেন্দ্র করে জীবনমান উন্নয়ন হবে আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার।

  • - পর্যটন বিপ্লব ও রোপওয়ে (Rope Way): সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটন শিল্পের বিকাশে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হবে। পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য সুন্দরবনে রোপওয়ে ব্যবস্থা করা হবে, যা স্থানীয় কর্মসংস্থান ও বিশ্বজুড়ে পরিচিতি বাড়াবে।

  • - জলদস্যু ও বনদস্যুমুক্ত বন: জেলে, বাওয়ালী ও মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতি মাসে যৌথবাহিনীর নিয়মিত অভিযানের ব্যবস্থা করা হবে।

  • - মৌয়াল ও মৎস্যজীবীদের অধিকার: হানি/মধু প্রসিং সেন্টার স্থাপন করে মধুর নায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং 'সাদা সোনা' খ্যাত চিংড়িসহ অন্যান্য মাছ রপ্তানির জন্য আধুনিক বাজারজাতকরণ পরিবেশ তৈরি করা হবে।

  • - ক্ষতিপূরণ ও ভাতা: সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণ বা দুর্ঘটনায় নিহতদের (বাঘবিধবা) ও আহতদের জন্য মাসিক ৭-১০ হাজার টাকা ভাতার ব্যবস্থা করা হবে।


৩. আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা বিপ্লব

"ঘর দোর হবে পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যসেবা হবে সকলের অধিকার" - এই লক্ষ্য নিয়ে স্বাস্থ্য খাতে আমূল পরিবর্তন আনা হবে।

  • - হাসপাতাল আধুনিকায়ন: শ্যামনগর হাসপাতালকে ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হবে  ও পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স নিশ্চিত করা হবে। গাবুরা, পদ্মপুকুর ও বুড়িগোয়ালিনীতে মিনি হাসপাতাল গঠন করা হবে।

  • - বিশেষায়িত ইউনিট: সরকারি হাসপাতালেই হার্ট, কিডনি এবং চোখের আধুনিক অপারেশন ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ব্যবস্থা করা হবে।

  • - বনজীবী হাসপাতাল: সুন্দরবনের নিকটবর্তী বুড়িগোয়ালিনীতে বনজীবীদের জরুরি চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত হাসাপাতাল নির্মাণ করা হবে।


৪. আধুনিক যাতায়াত ও অবকাঠামো

যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে ব্যবসা-বাণিজ্যকে গতিশীল করা হবে।

  • - রেলপথ সংযোগ: মুন্সিগঞ্জ থেকে বেনাপোল পর্যন্ত ট্রেন লাইন স্থাপনের ব্যবস্থা করা হবে, যাতে সুন্দরবনের পণ্য সহজে সরবরাহ করা যায়।

  • - বাস সার্ভিস ও স্ট্যান্ড: স্থানীয় বাস স্ট্যান্ডগুলোর আধুনিকায়ন এবং উন্নত বাস সার্ভিস চালু করা হবে।

  • - ডিজিটাল শিক্ষা: প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ মাল্টিমিডিয়া ও ডিজিটাল সিস্টেমের মাধ্যমে স্মার্ট শিক্ষা নিশ্চিত করা হবে।


৫. তারুণ্যের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি

যুবসমাজকে দক্ষ ও স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

  • - ক্ষুদ্র পুঁজি ও উদ্যোক্তা ঋণ: বেকার তরুণ ও নারীদের স্বাবলম্বী করতে সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ক্ষুদ্র পুঁজির ব্যবস্থা করা হবে।

  • - মাদকমুক্ত সমাজ: ভারত থেকে মাদক চোরাচালান বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি এবং যুবকদের ক্রীড়ামুখী করতে প্রতিটি ইউনিয়নে আধুনিক খেলার মাঠ ও জিমনেসিয়াম করা হবে।

  • - নারী ক্ষমতায়ন: তরুণী ও নারীদের জন্য কুটির শিল্প ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে।


৬. দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও সুশাসন

ভয় ও শোষনমুক্ত একটি মানবিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করা হবে।

  • - চাঁদাবাজ ও সিন্ডিকেট মুক্ত বাজার: নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কমাতে বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া হবে এবং এলাকাকে চাঁদাবাজ ও ভূমিদস্যুমুক্ত করা হবে।

  • - দুর্নীতি ও ঘুষমুক্ত প্রশাসন: সকল সরকারি অফিসকে ঘুষ ও দালালমুক্ত করে জনগণের সেবক হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

  • - আলেম ও ধর্মীয় সুরক্ষা: বিগত সময়ে নির্যাতিত আলেম সমাজের সম্মান পুনরুদ্ধার এবং সকল ধর্মের মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।

 

৭. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বৈষম্যহীন সমাজ

বিগত আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের সময়ে আমরা দেখেছি, কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য কৃত্রিম সাম্প্রদায়িক হামলা বা নাটক সাজিয়ে আমাদের বিভিন্ন ধর্মের ভাইদের মধ্যে বিভেদ ও অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা করত। তারা ধর্মীয় উপাসনালয়কে রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছে। ইনশাআল্লাহ, আমি নির্বাচিত হলে এই অপরাজনীতির অবসান ঘটাব।

  • - নিরাপদ উপাসনালয়: প্রতিটি মন্দির, গির্জা ও শ্মশানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। কোনো ধর্মীয় সংখ্যালঘুর জান-মালের ওপর আঘাত সহ্য করা হবে না।

  • - বিভেদহীন সমাজ: আমাদের এলাকায় 'সংখ্যালঘু' বা 'সংখ্যাগুরু' বলে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। আমরা সবাই এ দেশের নাগরিক এবং সবাই সাতক্ষীরার সন্তান।

  • - উৎসবে নিরাপত্তা: প্রতিটি ধর্মীয় উৎসব (যেমন: দুর্গাপূজা, ঈদুল ফিতর বা বড়দিন) যেন অত্যন্ত আনন্দ ও নিরাপত্তার সাথে পালিত হয়, সেজন্য বিশেষ সুরক্ষা বলয় তৈরি করা হবে।

  • - অধিকার রক্ষা: ধর্মীয় পরিচয়ে কারো সাথে বৈষম্য করা হবে না; বরং মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে।

 

শ্যামনগরকে একটি 'মডেল শ্যামনগরে' রূপান্তর করতে আমি বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী নজরুল ইসলাম আপনাদের দোয়া ও মূল্যবান ভোট চাইছি। আমি কেবল প্রতিনিধি হতে চাই না, আপনাদের ঘরের সন্তান হয়ে আপনাদের পাশে থাকতে চাই। আসুন, আমরা দল-মত নির্বিশেষে একটি সুন্দর ভবিষতের জন্য ঐক্যবদ্ধ হই। আপনার একটি মূল্যবান ভোটই পারে শ্যামনগরকে বদলে দিতে।


বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী নজরুল ইসলাম, সাবেক সংসদ সদস্য, সাতক্ষীরা-৪।